গাজা থেকে চিঠি

গাজা থেকে চিঠি

~5 min read
গাজা থেকে চিঠিChapter 1 of 1

প্রিয় মুস্তাফা,

এক্ষুনি তোর চিঠি পেলুম, তাতে তুই আমায় লিখেছিস যে স্যাক্রামেন্টোয় তোর ওখানে থাকবার জন্যে যা-যা করা জরুরি ছিল, সব তুই করে ফেলেছিস। আমি এই খবরও পেয়েছি যে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইনজিনিয়ারিং বিভাগে আমাকে নেয়া হয়েছে। তুই আমার জন্যে যা করেছিস, দোস্ত, সবকিছুর জন্যে তোকে ধন্যবাদ শুকরিয়া।

তবে এটা নিশ্চয়ই তোর কাছে একটু অদ্ভুত ঠেকবে যখন আমি এ খবরটা তোকে দেব- আর এ নিয়ে আমার মধ্যে কিন্তু কোনো দ্বিধা নেই, সত্যি-বলতে আমি নিশ্চিত বলতে পারি এখন আমি যেভাবে সবকিছু দেখছি এত স্বচ্ছ প্রাঞ্জলভাবে, এত স্পষ্ট করে, আগে আমি কিছুই দেখিনি। না দোস্ত, আমি আমার মত পালটেছি। আমি তোকে অনুসরণ করে সেই দেশে যাব না, যে দেশ শ্যামল, সজল আর সুশ্রী সুন্দর সব মুখে ভরা’- যেমন তুই লিখেছিস। না, আমি এখানেই থাকব- এবং কোনোদিন এ দেশ ছেড়ে যাব না।

আমি কিন্তু সত্যি বড্ড অস্বস্তিতে আছি, মুস্তাফা – আমাদের জীবন আর কখনোই এক খাতে বয়ে যাবে না। অস্বস্তির কারণ, আমি যেন শুনতে পাচ্ছি তুই আমায় মনে করিয়ে দিচ্ছিস- কী রে, আমরা না কথা দিয়েছিলুম সব সময় এক সঙ্গে থাকব, যেমন আমরা চিরকাল এক সাথে বলে উঠতাম : ‘আমরা বড়লোক হবই! আমাদের অনেক টাকা হবে!’ কিন্তু দোস্ত, কিছুই আর আমার করার নেই। হ্যাঁ, আমার এখনো সেদিনটা মনে পড়ে যেদিন কায়রোর হাওয়াই আড্ডার হলে দাঁড়িয়ে আমি তোর হাত চেপে ধরেছিলুম, তাকিয়েছিলুম ক্ষিপ্ত মোটরটার ঘূর্ণির দিকে। কান-ফাটানো মোটরের আওয়াজে সময়ের মধ্যে সেই মুহূর্তে সবকিছুই ঘুরে যাচ্ছে, আর তুই দাঁড়িয়ে আছিস আমার সামনে, তোর সুগোল মুখখানা স্তব্ধ।

গাজার শাজিয়া মহল্লায় তুই যখন বড় হচ্ছিলি, তখন যেমন ছিল তা থেকে একতিলও বদলায়নি তোর মুখ— শুধু কতগুলি ক্ষীণ ভাঁজ পড়েছে চোখের পাশে। আমরা দু’জনে এক সঙ্গেই বড় হয়েছি, মুস্তাফা পরস্পরকে আমরা পুরোপুরি বুঝি, আর আমরা পরস্পরকে জবানও দিয়েছিলুম যে শেষ অবধি দু’জনে এক সঙ্গেই যাব। কিন্তু …

‘হাওয়াই জাহাজ ছাড়বার আগে আরো পনের মিনিট সময় আছে হাতে। অমনভাবে হাঁ করে আকাশে তাকিয়ে থাকিস না। শোন। পরের বছর তুই কুয়েত যাবি, মাইনে যা পাবি তা থেকে যথেষ্ট টাকা বাঁচাতে পারবি, গাজার মাটি থেকে শেকড় ওপড়াতে তা-ই যথেষ্ট, তারপর ক্যালিফোর্নিয়া গিয়ে নতুন করে শেকড় পুঁতবি। আমরা এক সঙ্গে সব শুরু করেছি, আর এক সঙ্গেই চালিয়ে যেতে হবে আমাদের…’

সেই মুহূর্তে আমি তোর ঠোঁটের দ্রুত নড়াচড়া দেখছিলুম, মুস্তাফা। তোর কথা বলবার ধরনটাই ছিল ও-রকম, দাড়ি-কমা বাদ দিয়ে হড়বড় করে তোড়ে বলে চলা।

কিন্তু আবছাভাবে আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল তোর এই পালানোতে তুই পুরোপুরি সুখী নোস। পালাবার তিনটে ভালো কারণ তুই দেখাতে পারিসনি। আমিও সর্বক্ষণ এই আক্ষেপে ভুগেছি, কিন্তু সবচেয়ে স্পষ্ট চিন্তাটা ছিল : এই গাজাকে ছেড়ে রেখে সবাই মিলে পালিয়ে যাই না কেন আমরা? কেন যাই না/ কেন পারি না?

কেন, তবু আমার মনে হলো এটা যেন কোনো সূচনা। আমার মনে হলো, যে বড় রাস্তাটা ধরে আমি হেঁটে ফিরেছিলুম বাড়ি, সে যেন সাফাদের দিকে ছুটে যাওয়া দীর্ঘ, দীর্ঘ কোনো পথের আরম্ভ। এই গাজায় সবকিছু দপদপ করছে বিষাদে, মনস্তাপে, যা শুধুই কোনো রোদনের মধ্যে আবদ্ধ নয়। যুদ্ধের আহবান এই বিষাদ। তারও বেশি, এ যেন কাটা পা ফিরে পাবার জন্যে একটা প্রচণ্ড নাছোড় দাবি!

গাজার রাস্তায়-রাস্তায় আমি হেঁটে বেড়ালুম, চোখ ধাঁধানো আলোয় ভরা সব রাস্তা। ওরা আমাকে বলেছে- নাদিয়া তার পা হারিয়েছে, যখন সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার ছোট-ছোট ভাইবোনদের ওপর, তাদের ঢেকে দিয়েছিল নিজের ছোট্ট শরীরটা দিয়ে, বোমা আর আগুন থেকে তাদের বাঁচাতে, যে-আগুনের হিংস্র থাবা তখন বাড়িটায় পড়েছিল। নাদিয়া নিজেকে বাঁচাতে পারত, সহজেই সে ছুটে পালিয়ে যেতে পারত লম্বা-লম্বা পা ফেলে, রক্ষা করতে পারত তার পা। কিন্তু সে তা করেনি।

কেন?

না, মুস্তাফা, দোস্ত আমার, আমি স্যাক্রামেন্টো যাব না- আর তাতে আমার কোনো খেদ নেই। না। আর ছেলেবেলায় এক সাথে আমরা যা শুরু করেছিলুম, তা- ও আমরা শেষ করব না। সেই আবছা মতো অনুভূতি যা তুই গাজা ছেড়ে যাবার সময় অনুভব করেছিলি, সেই ছোট্ট বোধটাকে বিশাল হয়ে গড়ে উঠতে দিতে হবে তোর ভেতরে। ছড়িয়ে পড়তে দিতে হবে তাকে, নিজেকে ফিরে পাবার জন্যে হাতড়াতে হবে তোকে, তন্নতন্ন করে তোকে নিজেকে খুঁজতে হবে পরাজয়ের এই ধ্বংসস্তূপে।

আমি তোর কাছে যাব না, মুস্তাফা। বরং তুই, তুই আমাদের কাছে ফিরে আয়। ফিরে আয়, মুস্তাফা, নাদিয়ার কাটা পা-দু’টি থেকে শিখতে, উরুর ওপর থেকে কাটা, ফিরে আয় জানতে কাকে বলে জীবন, অস্তিত্বের মূল্য কী আর কতটা!

ফিরে আয়, মুস্তাফা, দোস্ত আমার, দোহাই, ফিরে আয়! আমরা সবাই তোর জন্যে উদ্‌গ্রীব, অপেক্ষা করে আছি।