সেদিন বিকেলটা অন্যরকম ছিল।
সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা। মাঝে মাঝে ঠান্ডা বাতাস এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছের পাতাগুলো নাড়িয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে।
রায়ান লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। হাতে একটা বই, অথচ বইটার দিকে তার কোনো মনোযোগ ছিল না।
পেছন থেকে তানভীর এসে বলল,
— আবার আকাশ দেখছিস কেন?
রায়ান ফিরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে।
— বৃষ্টি আসবে কি না সেটা আবহাওয়া অফিস বলবে। তুই এত চিন্তা করছিস কেন?
— কিছু না।
তানভীর কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— তোর এই ‘কিছু না’ কথাটার মধ্যেই সবচেয়ে বেশি কিছু থাকে।
রায়ান আর কিছু বলল না। লাইব্রেরির দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল।
পুরোনো বইয়ের গন্ধটা তার ভালো লাগত। বাইরে যতই কোলাহল থাকুক, লাইব্রেরিতে ঢুকলেই মনে হতো পৃথিবীটা একটু ধীরে চলছে।
সে জানালার পাশের একটা টেবিলে বসে বই খুলল।
কয়েক মিনিট পর হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হলো।
একজন মেয়ে তাড়াহুড়ো করে ভেতরে ঢুকল। তার হাতে বেশ কয়েকটা বই। বৃষ্টির আগে হয়তো দ্রুত বই নিয়ে বের হয়ে যেতে চাইছিল।
কিন্তু দরজার পাশের ছোট্ট সিঁড়িতে পা আটকে গেল।
মুহূর্তের মধ্যে বইগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।
মেয়েটা বিরক্ত মুখে বইগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
রায়ান উঠে দাঁড়াল।
— সাবধানে।
সে নিচু হয়ে বইগুলো তুলে দিতে লাগল।
মেয়েটাও একই সময়ে একটা বই তুলতে গিয়ে রায়ানের হাতের সঙ্গে হাত ছুঁয়ে ফেলল।
দুজনেই এক মুহূর্ত থেমে গেল।
মেয়েটা হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,
— সরি।
— না, ঠিক আছে।
রায়ান বইগুলো গুছিয়ে তার হাতে দিল।
মেয়েটা মৃদু হেসে বলল,
— ধন্যবাদ।
তারপর চলে যেতে গিয়েও থেমে গেল।
রায়ানের চোখ পড়ল তার হাতে থাকা বইটির দিকে।
— বইটা ভালো।
মেয়েটা ফিরে তাকাল।
— আপনি পড়েছেন?
— অনেক আগে।
— কেমন লেগেছিল?
রায়ান একটু ভেবে বলল,
— শেষ করার পর মনে হয়েছিল, গল্পটা এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল কেন?
মেয়েটা হেসে বলল,
— সব গল্পের তো একটা শেষ থাকে।
রায়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— সব গল্পের?
মেয়েটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
— কিছু গল্পের শেষ হয় না। শুধু মানুষগুলো আলাদা হয়ে যায়।
কথাটা বলে সে চলে গেল।
রায়ান কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল।
তানভীর কখন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, সে খেয়ালই করেনি।
— কী হলো?
রায়ান চমকে তাকাল।
— কিছু না।
তানভীর হেসে বলল,
— আবার সেই ‘কিছু না’!
রায়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
— চুপ কর।
কিন্তু তার মন আর বইয়ের পাতায় ফিরল না।
কিছুক্ষণ পর জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।
মেয়েটা লাইব্রেরির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। হাতে একটা ছাতা, কিন্তু ছাতাটা খুলছে না।
কয়েকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে সে বিরক্ত মুখে ছাতাটার দিকে তাকিয়ে আছে।
রায়ান নিজের ছাতাটা হাতে নিয়ে বাইরে গেল।
— সাহায্য লাগবে?
মেয়েটা তাকিয়ে একটু হেসে বলল,
— মনে হচ্ছে আমার ছাতাটা আজ আমার ওপর রাগ করেছে।
রায়ান ছাতাটা হাতে নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতেই সেটা খুলে গেল।
মেয়েটা অবাক হয়ে বলল,
— বাহ! আপনি তো ছাতা ঠিক করতেও পারেন!
— আসলে ভাগ্য ভালো ছিল।
— তাহলে আজ আমার ভাগ্যও ভালো।
রায়ান হেসে ফেলল।
মেয়েটা ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে বলল,
— আপনার নামটা জানা হলো না।
— রায়ান।
— আমি মেহরিন।
নামটা শুনে রায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
মেহরিন।
নামটার মধ্যেই যেন একটা অদ্ভুত মায়া ছিল।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
বৃষ্টির শব্দে চারপাশ ভরে গেছে। রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে শহরের আলো পড়ে ছোট ছোট ঢেউ তৈরি করছে।
কিছুদূর যাওয়ার পর মেহরিন বলল,
— আপনি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন?
— না।
— তাহলে?
রায়ান একটু হেসে বলল,
— আপনার সঙ্গে কথা বলার মতো বিষয় খুঁজে পাচ্ছি না।
মেহরিন হেসে ফেলল।
— অথচ বই নিয়ে বেশ ভালো কথা বলছিলেন।
— বই নিয়ে কথা বলা সহজ।
— মানুষ নিয়ে কঠিন?
রায়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— মানুষকে বোঝা কঠিন।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
— সবাইকে বোঝার দরকার নেই। কিছু মানুষকে শুধু অনুভব করলেই হয়।
রায়ান কোনো উত্তর দিল না।
রাস্তার মোড়ে এসে মেহরিন থামল।
— আমার বাড়ি এই দিকে।
— আচ্ছা।
— তাহলে যাই।
— হুম।
মেহরিন কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
— কাল লাইব্রেরিতে আসবেন?
রায়ান একটু অবাক হয়ে বলল,
— আপনি আসবেন?
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
— আপনি থাকলে আসব।
তারপর সে চলে গেল।
রায়ান অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
বৃষ্টি তখনও পড়ছিল।
কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, আজকের বৃষ্টিটা অন্যরকম।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে রায়ান জানালার পাশে বসে ছিল। কেন জানি বারবার একটা নামই মনে পড়ছিল—
মেহরিন।
একজন অচেনা মানুষ।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার পরিচয়।
তবুও মনে হচ্ছিল, এই পরিচয়টা হয়তো এখানেই শেষ হবে না।
হয়তো এটাই ছিল কোনো এক দীর্ঘ গল্পের প্রথম পৃষ্ঠা।
