বৃষ্টিভেজা শহরে তোমার অপেক্ষায়
বৃষ্টি নামলে নীলার মনটা কেমন যেন হয়ে যেত।
শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো যখন বৃষ্টির পানিতে ভিজে চকচক করত, নীলা তখন জানালার পাশে বসে এক কাপ চা হাতে নিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকত।
তার একটা অভ্যাস ছিল।
প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় ফোনটা হাতে নিয়ে একটা নামের দিকে তাকানো।
আরিয়ান।
কিন্তু সেই নামের পাশে আর কোনো নতুন মেসেজ আসত না।
আজও না।
প্রথম দেখা
তিন বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে তাদের প্রথম দেখা।
নীলা একটা বই খুঁজছিল। অনেকক্ষণ তাকিয়েও বইটা পাচ্ছিল না।
পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “আপনি কি এই বইটাই খুঁজছেন?”
নীলা ঘুরে তাকাল।
একজন ছেলে হাতে বইটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
— “হ্যাঁ।”
— “তাহলে মনে হয় বইটা আপনাকেই খুঁজছিল।”
নীলা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “বই আবার কাউকে খোঁজে নাকি?”
আরিয়ান হেসে বলল,
— “ভালো বইয়েরও তো পছন্দ থাকতে পারে।”
নীলা হাসি আটকাতে পারল না।
সেদিনই প্রথম তাদের কথা।
তারপর ধীরে ধীরে লাইব্রেরির টেবিল থেকে শুরু হলো বন্ধুত্ব।
বন্ধুত্ব থেকে অভ্যাস।
আর একসময়—
অজান্তেই ভালোবাসা।
সেই বিকেল
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদে দাঁড়িয়ে নীলা আকাশ দেখছিল।
আরিয়ান পাশে এসে দাঁড়াল।
— “কী দেখছ?”
— “মেঘ।”
— “মেঘের মধ্যে কী আছে?”
নীলা একটু চুপ করে বলল,
— “কিছু মানুষ থাকে, যাদের সামনে থাকলে কিছু বলতে হয় না।”
আরিয়ান তার দিকে তাকাল।
— “আমি কি সেই মানুষ?”
নীলা মুখ ঘুরিয়ে ফেলল।
— “জানি না।”
আরিয়ান হেসে বলল,
— “তাহলে একদিন জানাবে।”
নীলা সেদিন কোনো উত্তর দেয়নি।
কিন্তু তার নীরবতাই ছিল উত্তর।
হঠাৎ দূরত্ব
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল।
তারপর একদিন আরিয়ান হঠাৎ নীলাকে বলল—
— “আমাদের কিছুদিন যোগাযোগ না রাখাই ভালো।”
নীলা অবাক হয়ে গেল।
— “কেন?”
— “কিছু পারিবারিক সমস্যা আছে।”
— “আমি কি জানতে পারি?”
আরিয়ান মাথা নিচু করল।
— “এখন না।”
সেদিন নীলা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর শুধু বলেছিল—
— “ঠিক আছে।”
কিন্তু সেই “ঠিক আছে”-এর ভেতরে কতটা কষ্ট ছিল, আরিয়ান হয়তো বুঝতে পারেনি।
এরপর দিন গেল।
সপ্তাহ গেল।
মাস গেল।
আরিয়ান আর ফোন করল না।
নীলা অপেক্ষা করল।
প্রথমে প্রতিদিন।
তারপর সপ্তাহে একদিন।
শেষে শুধু বৃষ্টির দিনে।
তিন বছর পর
এক সন্ধ্যায় প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল।
নীলা জানালার পাশে বসে ছিল।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
সে ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা নেই।
তারপর সেই পরিচিত কণ্ঠ—
— “বৃষ্টি হচ্ছে?”
নীলার হাত কেঁপে উঠল।
সে কিছু বলতে পারল না।
কণ্ঠটা আবার বলল—
— “নীলা?”
নীলার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
— “হ্যাঁ।”
— “আমি ফিরে এসেছি।”
নীলা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “এতদিন কোথায় ছিলে?”
ওপাশে নীরবতা।
তারপর আরিয়ান বলল—
— “তোমাকে ছেড়ে যাইনি। তোমাকে হারানোর ভয়েই দূরে গিয়েছিলাম।”
— “তাহলে ফিরে এলে কেন?”
আরিয়ান ধীরে বলল,
— “কারণ বুঝেছি, কিছু মানুষকে হারানোর ভয় যতই থাকুক, তাদের ছাড়া জীবনটা আরও ভয়ংকর।”
আবার দেখা
পরদিন বিকেলে তারা সেই পুরোনো লাইব্রেরির সামনে দেখা করল।
নীলা দূর থেকে আরিয়ানকে দেখল।
তিন বছর আগের সেই মানুষটা।
শুধু চোখ দুটো একটু বেশি ক্লান্ত।
আরিয়ান কাছে এসে দাঁড়াল।
— “অনেক বদলে গেছ।”
নীলা মৃদু হেসে বলল,
— “তুমিও।”
— “রাগ করেছ?”
— “অনেক।”
— “ক্ষমা করবে?”
নীলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল—
— “জানি না।”
আরিয়ান মাথা নিচু করল।
নীলা কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আবার থামল।
পেছনে ফিরে বলল—
— “তবে একটা কথা জানি।”
— “কী?”
— “তোমার জন্য অপেক্ষা করা বন্ধ করতে পারিনি।”
আরিয়ান কিছু বলল না।
শুধু মৃদু হাসল।
বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
তারা দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
কেউ কাউকে হাত ধরে টানেনি।
কোনো বড় প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়নি।
শুধু তিন বছর পর
দুজন মানুষ আবার একই পথে হাঁটছিল।
আর কখনো কখনো ভালোবাসার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
একসঙ্গে হাঁটার জন্য একজন মানুষকে আবার ফিরে পাওয়া।
