শহরের রাজপথে তখন ট্রাফিকের দীর্ঘ সারি। বাসের হর্ন, রিকশার টুংটাং আর মানুষের কোলাহলে কান পাতা দায়। ট্রাফিক সিগন্যালের লাল বাতিটা যেন অনন্তকাল ধরে জ্বলছে। অরুণাভ বাসের জানালার ধারে বসে একমনে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার পরনে হালকা নীল রঙের শার্ট আর কাঁধে ঝুলছে একটা কালো ব্যাগ। তার শান্ত চোখজোড়ায় যেন সারা শহরের ক্লান্তি জমা হয়ে আছে। সে এই শহরে নতুন, এই কোলাহল আর ব্যস্ততার সাথে সে এখনও নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি।
সিগন্যাল ছেড়ে বাসটা চলতে শুরু করতেই অরুণাভের নজর পড়ল রাস্তার পাশের এক বইয়ের দোকানে। দোকানের কাঁচের ওপাশে এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে, একমনে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে। মেয়েটির পরনে সাদা রঙের কুর্তা আর এক কাঁধে ঝুলছে নকশা করা ব্যাগ। তার চঞ্চল চোখ আর মিষ্টি হাসি মুহূর্তেই অরুণাভের ক্লান্তি দূর করে দিল। বাসটা বইয়ের দোকান পেরিয়ে এগিয়ে গেল, কিন্তু সেই মেয়েটির মুখ অরুণাভের মনে গেঁথে রইল।
সেদিন বিকেলে অরুণাভ পার্কে হাঁটতে গিয়ে আবারও সেই মেয়েটিকে দেখল। সে পার্কের বেঞ্চে বসে একমনে আঁকিবুঁকি করছে। অরুণাভ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে এগিয়ে গেল।
"নমস্কার। আমি অরুণাভ। এই শহরে নতুন।"
মেয়েটি মুখ তুলে তাকাল। তার চোখের কালো মণি দুটো মুহূর্তের জন্য অরুণাভের শান্ত চোখের দিকে আটকে রইল। মেয়েটি আলতো হাসল, যে হাসিতে এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছিল।
"নমস্কার। আমি তিন্নি। এই শহরেরই মেয়ে।"
সেদিন বিকেল থেকেই তাদের পরিচয়। অরুণাভের গম্ভীর আর মিতভাষী স্বভাবের সাথে তিন্নির চঞ্চল আর প্রাণবন্ত রূপ যেন এক অদ্ভুত ভারসাম্য তৈরি করল। অরুণাভ তিন্নির কাছে খুঁজে পেয়েছিল এই অচেনা শহরে নিজের অস্তিত্ব, আর তিন্নি অরুণাভের কাছে খুঁজে পেয়েছিল এক শান্ত আশ্রয়।
কিন্তু প্রতিটি গভীর প্রেমের গল্পের মতোই, তাদের পথচলাও মসৃণ ছিল না। অরুণাভের পরিবার তার জন্য এক প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার মেয়ে পছন্দ করে রাখে। অন্যদিকে, তিন্নির বাবা এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, যিনি অরুণাভের মতো সাধারণ মধ্যবিত্ত যুবকের সাথে নিজের মেয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তায় ফেলতে রাজি ছিলেন না।
সামাজিক বাধা আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে তাদের ভালোবাসার বাঁধন আরও শক্ত হতে লাগল। একদিন অরুণাভ তিন্নিকে নিয়ে তার পছন্দের এক পাহাড়ি গ্রামে চলে গেল। সেখানে, মেঘের কোল ঘেঁষে এক ছোট কুটিরে তারা তাদের স্বপ্নের জগত গড়ে তুলল। কিন্তু সেই শান্ত জীবনও দীর্ঘস্থায়ী হলো না। অরুণাভের বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হলে, সে বাধ্য হয়ে শহরে ফিরে আসে।
অরুণাভের ফিরে আসার খবর শুনে তিন্নিও শহরে চলে আসে। কিন্তু তাদের দেখা করার কোনো উপায় ছিল না। অরুণাভ তার বাবার চিকিৎসার জন্য দিনরাত এক করে কাজ করতে থাকে। অন্যদিকে, তিন্নির বাবা তাকে অন্য একজনের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে।
জীবনের এই কঠিন সময়ে অরুণাভ আর তিন্নির ভালোবাসা যেন এক নতুন পরীক্ষা দিতে থাকে। একদিন অরুণাভের বাবা সুস্থ হয়ে উঠলে, অরুণাভ সব কথা খুলে বলে। অরুণাভের বাবা তার ছেলের ভালোবাসাকে সম্মান দিয়ে রাজি হয়ে যান। কিন্তু তিন্নির বাবা কিছুতেই রাজি ছিলেন না।
শেষ পর্যন্ত, অরুণাভ আর তিন্নি এক রোদজ্বলা বিকেলে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা এক দূর অচেনা শহরে চলে যায়, যেখানে কেউ তাদের চেনে না। সেখানে তারা নতুন করে তাদের জীবন শুরু করে। তাদের জীবনে নানা ঝড়-ঝাপটা এলেও, তাদের ভালোবাসা কখনও মলিন হয়নি।
আজ আবারও এক রোদজ্বলা বিকেলে, অরুণাভ আর তিন্নি পার্কের বেঞ্চে বসে আছে। অরুণাভের হাতে তার নতুন উপন্যাসের কপি। সে তিন্নির দিকে তাকিয়ে উপন্যাসের প্রথম পাতা উল্টাচ্ছে। তিন্নি উপন্যাসের প্রথম লাইনে অরুণাভের পরিচিত হাতের লেখা দেখে হেসে উঠল।
