সেই বিকেলের পর তিন্নি আর ফোনে ধরা দিল না। অরুণাভ পর পর দুদিন লেকের পাড়ে একই বেঞ্চে বসে রইল, কিন্তু হলুদ কুর্তি পরা চঞ্চল মেয়েটি আর এল না। শহরের চেনা কোলাহল হঠাৎ করেই যেন অসহ্য ভারী ঠেকতে লাগল।
তৃতীয় দিন দুপুরে অরুণাভের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এল—সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট: "আজ বিকেল পাঁচটায় সেন্ট্রাল লাইব্রেরির পেছনের ক্যাফেতে আসবে? শেষবারের মতো একটু কথা বলব। —তিন্নি।"
অরুণাভ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গিয়ে ক্যাফের একদম কোণের টেবিলটায় বসল। কিছুক্ষণ পরই কাঁচের দরজা ঠেলে তিন্নি ভেতরে ঢুকল। পরনে গাঢ় ধূসর শাড়ি, চোখ দুটো অসম্ভব ফোলা, আর মুখের সেই চঞ্চল হাসিটা যেন কেউ জোর করে মুছে দিয়েছে।
সামনে এসে বসার পর তিন্নি কিছুক্ষণ শুধু টেবিলের কাঠের নকশার দিকে তাকিয়ে রইল। অরুণাভ হাত বাড়িয়ে তিন্নির বরফশীতল আঙুলগুলো স্পর্শ করতে গিয়েও নিজেকে থামিয়ে নিল।
"কী হয়েছে তিন্নি? বাসায় কী ঘটেছে?" অরুণাভের কণ্ঠস্বর শান্ত রাখার চেষ্টার মধ্যেও কেঁপে উঠল।
তিন্নি মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে জমে থাকা জল আর বাঁধ মানল না। ধরা গলায় সে বলল, "বাবা সব জেনে গেছেন। তোমার নাম, তুমি কী কাজ করো, আমরা কোথায় দেখা করি—সবকিছু। গত রাতে বাবা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ওনার রাজনৈতিক প্রতিপত্তির সামনে তোমার মতো মধ্যবিত্ত লেখকের কোনো জায়গা নেই। আগামী মাসের তেরো তারিখ ওনার ব্যবসায়িক অংশীদারের ছেলের সাথে আমার বিয়ের তারিখ ঠিক করা হয়েছে।"
টেবিলের ওপর নীরবতা জমে পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠল। ক্যাফের ভেতর মৃদু বাদ্যযন্ত্রের সুর বাজছিল, কিন্তু অরুণাভের কানে তখন কেবল নিজের হৃৎস্পন্দনের তীব্র শব্দ।
"তুমি কী চাও, তিন্নি?" অরুণাভ সরাসরি তিন্নির চোখের দিকে তাকাল।
"আমি তোমাকে চাই, অরুণাভ!" তিন্নির ঠোঁট কাঁপছিল। "আমি বাবার এই মেকি আভিজাত্যের বন্দিদশা থেকে বাঁচতে চাই। তুমি আমাকে নিয়ে কোথাও দূরে চলে চলো। যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না, যেখানে বাবার প্রভাব পৌঁছাবে না।"
অরুণাভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার ওপারে তাকাল। বাইরে বিকেলের শেষ রোদ ফিকে হয়ে এক অদ্ভুত ধূসর রূপ নিয়েছে। সে তিন্নির দিকে তাকিয়ে দৃঢ় অথচ ব্যথাতুর কণ্ঠে বলল, "পালিয়ে গিয়ে ঘর বাঁধলে হয়তো কিছুদিন আমরা বাঁচব, কিন্তু বাবার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে তুমি সারা জীবন অপরাধবোধে পুড়বে। আমি তোমার জীবনে সেই অভিশাপ হতে চাই না।"
"তার মানে তুমি আমাকে ছেড়ে দিচ্ছ?" তিন্নির গলায় অভিমান আর ক্ষোভ মিশে একাকার হয়ে গেল।
"আমি তোমাকে ছেড়ে দিলে তো নিজের অস্তিত্বকেই ছেড়ে দেব," অরুণাভ পকেট থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করে তিন্নির সামনে রাখল। সেখানে লেখা ছিল পাহাড়ি এক ছোট শহরের ঠিকানা। "আমার উত্তরবঙ্গে একটা পুরোনো বাড়ি আছে। আমি সেখানে চলে যাচ্ছি আজ রাতেই। পরিবারকে বুঝিয়ে যদি নিজের অধিকারে কোনোদিন বের হয়ে আসতে পারো, এই রোদজ্বলা বিকেলের শপথ—আমি আজীবন তোমার জন্য সেই দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করব।"
তিন্নি কাগজটি শক্ত করে মুঠোয় আঁকড়ে ধরল। কিছু না বলে শুধু একপলক চেয়ে রইল, তারপর অশ্রুভেজা চোখে ক্যাফে ছেড়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
