উত্তরের পাহাড়ি মফস্বল শহরটায় রোদ আর মেঘের অদ্ভুত লুকোচুরি। চারপাশের পাইন আর ওকের বন যখন বাতাসে মৃদু শব্দ তোলে, অরুণাভের কাঠের ঘরের বারান্দায় বসে থাকে নির্জনতা।
শহরের পাট চুকিয়ে অরুণাভ এখানে এসে উঠেছে মাসখানেক হলো। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সে স্থানীয় এক পাঠাগারে কাজ করে, আর বিকেল নামলে নিজের ঘরের কাঠের টেবিলে বসে উপন্যাসের পাতায় ফুটিয়ে তোলে তার আর তিন্নির ফেলে আসা মুহূর্তগুলো। তার প্রতিটি অনুচ্ছেদে জড়িয়ে থাকে এক জোড়া চঞ্চল চোখের চাহনি আর পড়ন্ত বিকেলের বিষাদ।
পাহাড়ে তখন হালকা শীত নেমেছে। প্রতিদিন গোধূলিলগ্নে অরুণাভ কাঠের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে নেমে যাওয়া সরু সর্পিল রাস্তাটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সে জানে, এই পথটা অসম্ভব কঠিন। বাবার কড়া পাহারা আর সামাজিক প্রাচীর ভেঙে একজন মেয়ের পক্ষে এভাবে একা চলে আসা প্রায় অলীক স্বপ্নের মতো। তবুও মানুষের বুকের ভেতর যে অদ্ভুত আশার চারা বেঁচে থাকে, তা যুক্তি মানতে চায় না।
সেদিন ছিল পূর্ণিমা। বিকেলের রোদ যখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে পাহাড়ি উপত্যকায় নীলাভ চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, ঠিক তখনই দূর থেকে কাঁচা রাস্তায় এক জোড়া গাড়ির চাকার শব্দ শোনা গেল।
মফস্বলের পাহাড়ি রাস্তায় সাধারণত সন্ধ্যার পর গাড়ি চলে না। অরুণাভ চমকে উঠে কাঠের রেলিং ধরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। একটি পুরোনো ট্যাক্সি তার ছোট কাঠের কুটিরের গেটের মুখে এসে থামল।
গাড়ির দরজা খুলে ধীরপায়ে নেমে এল এক তরুণী। পরনে হালকা নীল সুতির চাদর, হাতে সামান্য একটা কাপড়ের ব্যাগ, আর ধুলোবালি মাখা মুখটিতে ক্লান্তি থাকলেও চোখে জ্বলজ্বল করছে অদম্য এক জেদ।
অরুণাভ যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার পা দুটো মাটিতে জমে গেছে।
গেটের শিকল খুলে তিন্নি উঠোনে পা রাখল। চাদরের নিচ থেকে সে বের করল সেই বিবর্ণ হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরোটি, যা ক্যাফের টেবিলে অরুণাভ রেখে এসেছিল। বাতাসে তিন্নির এলোমেলো চুলগুলো উড়ছিল।
"বাবার আভিজাত্য আর সম্পদের খাঁচা আমি ভেঙে এসেছি, অরুণাভ," তিন্নির গলা আবেগে কাঁপছিল, কিন্তু তার দৃষ্টি ছিল দ্বিধাহীন। "বাবাকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে এসেছি—যে জীবনে আত্মসম্মান আর ভালোবাসা নেই, সে জীবন আমি মেনে নেব না। তুমি বলেছিলে না, নিজের অধিকারে আসতে পারলে তবেই যেন আসি? আমি এসেছি।"
অরুণাভ দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এল। চাঁদের মায়াবী আলো আর কুয়াশার চাদরে ঢাকা সেই রাতে দুটো হারিয়ে যাওয়া হৃদয় একে অপরের খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল।
অরুণাভ তিন্নির হাত দুটো নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় তুলে নিল। যে মানুষটি সচরাচর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে ভয় পেত, তার চোখ দিয়ে আজ নীরবে গড়িয়ে পড়ল কৃতজ্ঞতার জল।
