- পরদিন বিকেল পাঁচটার অনেক আগেই রায়ান নদীর পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছিল।
নিজের ওপরই তার একটু রাগ হচ্ছিল। এত আগে আসার কোনো দরকার ছিল না। তবুও সে এসেছিল।
নদীর ওপরে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছিল। দূরে নৌকাগুলো ধীর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। বাতাসে কেমন একটা শান্ত গন্ধ।
রায়ান বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল।
পাঁচটা বাজতে আর দশ মিনিট বাকি।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল,
— এত তাড়াতাড়ি চলে এসেছেন?
রায়ান ঘুরে তাকাল।
মেহরিন।
আজ তার পরনে সাদা-নীল পোশাক। হাতে একটা ছোট ব্যাগ। মুখে সেই পরিচিত হাসি।
রায়ান বলল,
— আমি সময়ের একটু আগেই চলে এসেছি।
মেহরিন হেসে বলল,
— একটু?
— হ্যাঁ।
— ঘড়িতে তো চারটা ত্রিশ বাজে।
রায়ান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
— আসলে রাস্তা ফাঁকা ছিল।
— বুঝেছি।
দুজন পাশাপাশি নদীর পাড় ধরে হাঁটতে লাগল।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
অদ্ভুতভাবে এই নীরবতাটাও তাদের কাছে অস্বস্তিকর লাগছিল না।
মেহরিন হঠাৎ বলল,
— তুমি কি কখনো কাউকে খুব মিস করেছ?
রায়ান একটু থেমে গেল।
— কেন?
— এমনি।
— হ্যাঁ। করেছি।
— কাকে?
রায়ান নদীর দিকে তাকাল।
— একজনকে।
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
— সে কি জানত?
— না।
— কেন বলোনি?
— ভয় ছিল।
— কিসের ভয়?
রায়ান এবার মেহরিনের দিকে তাকাল।
— হারিয়ে ফেলার।
মেহরিন কিছু বলল না।
তার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত পর সে বলল,
— কাউকে ভালোবাসলে তাকে হারানোর ভয় থাকবেই। কিন্তু না বললে তো মানুষটাকে পাওয়ার সুযোগটাও থাকে না।
রায়ান হেসে বলল,
— তুমি খুব সহজে কথা বলো।
— কারণ আমি এখনো কাউকে ভালোবাসিনি।
কথাটা শুনে রায়ানের বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।
সে আর কিছু বলল না।
তারা নদীর ধারে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল।
সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে নেমে যাচ্ছে। আকাশের রং বদলে যাচ্ছে—কমলা, লাল আর হালকা বেগুনি।
মেহরিন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
— জানো, সূর্যাস্ত আমার খুব পছন্দ।
— সূর্যোদয় না?
— সূর্যোদয় নতুন শুরুর কথা বলে। আর সূর্যাস্ত মনে করিয়ে দেয়, সুন্দর জিনিসও একদিন শেষ হয়ে যায়।
রায়ান মৃদু হেসে বলল,
— তুমি সবকিছুর মধ্যে এত দুঃখ খুঁজে পাও কেন?
মেহরিন তার দিকে তাকাল।
— কারণ সুখের সময় মানুষ খুব কমই ভাবে, এটা একদিন শেষ হয়ে যাবে।
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— সবকিছু শেষ হয় না।
— যেমন?
— কিছু মানুষ।
মেহরিন তাকিয়ে রইল তার দিকে।
দুজনের চোখে চোখ আটকে গেল।
কয়েক সেকেন্ড।
তারপর মেহরিন চোখ সরিয়ে নিল।
— চা খাব?
রায়ান হেসে ফেলল।
— এত গভীর কথা থেকে সরাসরি চা?
— গভীর কথা বেশি হয়ে গেলে মাথা ব্যথা করে।
দুজনেই হাসল।
চায়ের দোকানে বসে তারা অনেকক্ষণ গল্প করল।
সেদিন ফেরার সময় মেহরিন হঠাৎ বলল,
— রায়ান?
— হুম?
— তুমি কি আমাকে বন্ধু ভাবো?
প্রশ্নটা শুনে রায়ান একটু থেমে গেল।
— হ্যাঁ।
মেহরিন মাথা নাড়ল।
— আমিও।
তারপর দুজনেই চুপ করে হাঁটতে লাগল।
কিন্তু সেই ‘বন্ধু’ শব্দটার ভেতরে সেদিন এমন কিছু ছিল, যা তারা কেউ মুখে বলল না।
দিনগুলো দ্রুত চলে যেতে লাগল।
লাইব্রেরিতে দেখা, একসঙ্গে চা খাওয়া, নদীর পাড়ে হাঁটা—সবকিছু যেন তাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে গেল।
রায়ান বুঝতে পারছিল, সে মেহরিনকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ভাবছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে তার কথা মনে পড়ে।
রাতে ঘুমানোর আগে শেষবার তার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে।
মেহরিনও বদলে যাচ্ছিল।
রায়ান একদিন লাইব্রেরিতে না এলে সে বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত।
একদিন রায়ান জিজ্ঞেস করল,
— আজ এত চুপ কেন?
মেহরিন বলল,
— তুমি কাল আসোনি।
— তাই?
— হ্যাঁ।
— আমাকে মিস করেছিলে?
মেহরিন একটু থেমে বলল,
— হয়তো।
রায়ান হেসে ফেলল।
— ‘হয়তো’ কেন?
মেহরিন বই খুলে বলল,
— বেশি জেনে লাভ নেই।
রায়ান তার পাশে বসে মৃদুস্বরে বলল,
— তাহলে আমিও একটা কথা বলব না।
— কী কথা?
— কাল তোমাকে খুব মিস করেছি।
মেহরিন বইয়ের পাতার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে যে হাসিটা ফুটে উঠেছিল, সেটা রায়ানের চোখ এড়াল না।
সেদিন প্রথমবার রায়ানের মনে হলো—
তাদের সম্পর্কটা হয়তো আর শুধু বন্ধুত্বের মধ্যে নেই।
কিন্তু সে তখনো জানত না, এই সুন্দর সময়ের ঠিক পরেই তাদের জীবনে এমন একটা ঝড় আসছে, যা দুজনের পৃথিবীকে একেবারে বদলে দেবে।
