পার্কের সেই প্রথম পরিচয়ের পর কেটে গেছে বেশ কয়েকটা সপ্তাহ। ইট-পাথরের ধূসর শহরটা অরুণাভের কাছে আর আগের মতো নিঃসঙ্গ মনে হয় না। প্রতিদিন ঘড়ির কাঁটা যখন চারটা ছুঁইছুঁই করে, তখন অদ্ভুত এক চঞ্চলতা ঘিরে ধরে তাকে। অফিসের কাজের ফাঁকে ফাইলের পাতায় চোখ রাখলেও মন পড়ে থাকে লেকপাড়ের সেই মেহগনি গাছের নিচে।
তিন্নি ঠিক সাড়ে চারটায় আসে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। হালকা হলুদ সুতির কুর্তি, খোলা চুলে হালকা বাতাসের দোলা আর মুখে লেগে থাকা চিরচেনা মিষ্টি হাসি নিয়ে সে এগিয়ে এল। হাতে এক ঠোঙা গরম চিনাবাদাম।
"কী মিস্টার লেখক, আজকেও কি পুরো শহরের দুঃখ নিজের কাঁধে নিয়ে বসে আছেন?" তিন্নির গলার আওয়াজে অরুণাভ চমকে তাকাল।
অরুণাভ হাসল। ওর শান্ত মুখের সেই মৃদু হাসি যেন তিন্নির সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য। সে পাশে সরে বসে বলল, "দুঃখ নয়, ভাবছিলাম শহরটা আসলে বদলে গেছে, নাকি দেখার চোখটা বদলে গেল।"
তিন্নি বাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে চোখ ছোট করে তাকাল, "শহর একই আছে, শুধু আপনার একঘেয়ে জীবনে আমার মতো এক চিমটি রঙের ছোঁয়া লেগেছে, তাই না?"
"হতে পারে," অরুণাভের গলার স্বর হঠাৎ গম্ভীর ও নরম হয়ে এল। সে তিন্নির চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তিন্নির চঞ্চল চোখদুটো মুহূর্তে কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে গেল। সচরাচর যে কথার ঝুড়ি নিয়ে তিন্নির উপস্থিতি মুখর থাকে, সেই তিন্নি হঠাৎ চোখ নামিয়ে নিল। বাতাসের ঝাপটায় তার কপালের ওপর উড়ে আসা কয়েক গোছা চুল সরিয়ে নিতে নিতে সে অনুচ্চ স্বরে বলল, "অরুণাভ, তুমি সব কথা এত গভীরভাবে কেন বলো? শুনলে মনের ভেতর কেমন একটা তোলপাড় হয়।"
অরুণাভ কিছু না বলে লেকের জলে তাকাল। পড়ন্ত বিকেলের সোনালি রোদ তখন জলের ঢেউয়ে হাজারটা রূপোলি টুকরো হয়ে জ্বলছে। প্রকৃতি যেন দুজনের না-বলা কথাগুলো বুঝতে পেরেই চারপাশটা নিস্তব্ধ করে দিয়েছে।
হঠাৎ তিন্নির ফোনের তীক্ষ্ণ রিংটোনে সেই মায়াবী নীরবতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। স্ক্রিনে 'বাবা' নামটা ভেসে উঠতেই তিন্নির মুখের সব উজ্জ্বলতা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল, সেখানে নেমে এল একরাশ শঙ্কা।
কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা কানে ধরে তিন্নি বলল, "হ্যাঁ, বাবা... আসছি। রাস্তায় আছি।"
ফোন রেখেই সে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। তার ব্যাগের ফিতাটা কাঁধে তুলতে গিয়ে হাত কাঁপছিল।
"কী হয়েছে, তিন্নি? কোনো সমস্যা?" অরুণাভ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে দাঁড়াল।
তিন্নি অরুণাভের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে জমে ওঠা জলের বিন্দু বিকেলের শেষ আলোয় চিকচিক করে উঠল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "আজ বাসায় বিশেষ মেহমান আসবে... বাবার এক ব্যবসায়ী বন্ধুর পরিবার। আমার নাকি থাকা জরুরি।"
অরুণাভ বুঝতে পারল কথার পেছনের ইঙ্গিত। বুকের ভেতর এক অজানা আতঙ্কের শীতল স্রোত বয়ে গেল। কিন্তু সে শান্ত থাকার চেষ্টা করে তিন্নির কাঁধে হাত রাখতে গিয়েও সংবরণ করল, "তুমি সাবধানে যাও।"
তিন্নি কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। ফিরে এসে অরুণাভের হাতটা শক্ত করে নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে নিল। তার আঙুলগুলো কাঁপছিল, কিন্তু স্পর্শে ছিল অসম্ভব এক নির্ভরতা।
"অরুণাভ, যাই হয়ে যাক না কেন, আমাকে ভুল বুঝবে না তো? এই রোদজ্বলা বিকেলগুলো শুধু তোমার আর আমার... এটা কোনোদিন বদলে যেতে দিও না।"
