পরদিন সকালটা রায়ানের কাছে অস্বাভাবিক দীর্ঘ মনে হচ্ছিল।
ঘড়ির কাঁটা যেন ইচ্ছে করেই ধীরে চলছে। বারবার ফোনের স্ক্রিন দেখছিল সে। মেহরিনের কোনো মেসেজ নেই।
গতকাল যাওয়ার সময় মেহরিন বলেছিল, “কাল।”
সেই একটা কথার ওপর ভরসা করেই রায়ান সকাল থেকে অপেক্ষা করছিল।
দুপুর পেরিয়ে বিকেল হলো।
মেহরিন এল না।
রায়ান নিজেই ফোন করল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
ফোন বন্ধ।
তার বুকের ভেতর অজানা একটা আশঙ্কা জমতে শুরু করল।
শেষ পর্যন্ত বিকেল পাঁচটার দিকে সে লাইব্রেরিতে চলে গেল।
যে টেবিলে মেহরিন প্রায়ই বসত, সেটাই খালি।
রায়ান সেখানে বসে রইল।
এক ঘণ্টা।
দুই ঘণ্টা।
লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার সময় কর্মচারী এসে বলল,
— বাবা, আজ আর কেউ আসবে না। বাড়ি যাও।
রায়ান ধীরে উঠে দাঁড়াল।
বাইরে বেরিয়ে দেখল, আকাশ কালো হয়ে আছে।
হঠাৎ তার ফোনে একটা মেসেজ এল।
মেহরিন।
রায়ানের বুক ধক করে উঠল।
সে দ্রুত মেসেজ খুলল।
“রায়ান, কিছুদিন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা কোরো না। বাড়িতে অনেক সমস্যা চলছে। আমাকে ভুল বোঝার চেষ্টা কোরো না। সময় হলে সব বলব।”
রায়ান মেসেজটা পড়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর কল করল।
ফোন বন্ধ।
আবার কল করল।
একই ফল।
সে জানত না কী হয়েছে।
শুধু বুঝতে পারছিল, মেহরিন তাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
কিন্তু কেন?
পরের কয়েকটা দিন রায়ানের কাছে খুব কঠিন হয়ে উঠল।
মেহরিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে না।
লাইব্রেরি খালি।
নদীর পাড়ে গেলে আগের বিকেলগুলো মনে পড়ে।
চায়ের দোকানে গেলে তার হাসিটা কানে বাজে।
তানভীর সব বুঝতে পারছিল।
একদিন সে বলল,
— তুই ওর সঙ্গে কথা বলেছিস?
— চেষ্টা করেছি।
— কী বলেছে?
রায়ান ফোনটা এগিয়ে দিল।
তানভীর মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
— মনে হচ্ছে ওর বাসায় সমস্যা হয়েছে।
— তাহলে আমাকে বলছে না কেন?
— হয়তো পারছে না।
রায়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— আমি ওকে হারাতে চাই না।
তানভীর তার কাঁধে হাত রাখল।
— তাহলে অপেক্ষা কর।
রায়ান মৃদু হেসে বলল,
— কতদিন?
তানভীর উত্তর দিতে পারল না।
অন্যদিকে মেহরিনের জীবনও সহজ ছিল না।
তার বাবা বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।
ছেলেটির নাম আদনান।
ভালো পরিবার, ভালো চাকরি, ভালো মানুষ—সবদিক থেকেই পরিবারের কাছে সে উপযুক্ত।
কিন্তু মেহরিনের কাছে একটা জিনিসই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সে রায়ানকে ভালোবাসে।
এক রাতে সে নিজের ঘরে বসে রায়ানের দেওয়া ডায়েরিটা খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা—
“যে কথাগুলো মুখে বলা যায় না, সেগুলো এখানে লিখে রেখো।”
মেহরিন কলম হাতে নিল।
অনেকক্ষণ কিছু লিখতে পারল না।
শেষে লিখল—
“রায়ান,
আমি জানি না এই চিঠি কখনো তোমার কাছে পৌঁছাবে কি না।
আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই না।
কিন্তু কিছু মানুষ নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও সবসময় পায় না।
যদি কোনো দিন তুমি ভাবো আমি তোমাকে ভালোবাসিনি, তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।
আমি তোমাকে ভালোবাসি।
হয়তো এই কথাটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ।”
চিঠিটা লিখে সে চোখের পানি মুছে ফেলল।
তারপর চিঠিটা ডায়েরির ভেতর রেখে দিল।
দুই সপ্তাহ কেটে গেল।
রায়ান আর কোনো খবর পেল না।
একদিন সন্ধ্যায় সে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ দূর থেকে একটা গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে একজন মধ্যবয়স্ক লোক নামলেন।
তিনি কিছুক্ষণ রায়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তুমি কি রায়ান?
রায়ান অবাক হয়ে বলল,
— জি।
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— মেহরিনের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক আছে?
রায়ানের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
সে বুঝতে পারল—
এটাই মেহরিনের বাবা।
রায়ান নিজেকে সামলে বলল,
— জি। আমি মেহরিনকে ভালোবাসি।
লোকটির মুখ শক্ত হয়ে গেল।
— আমার মেয়ের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করবে না।
রায়ান চুপ করে রইল।
— তুমি কি জানো, তোমার জন্য আমার মেয়ে কত সমস্যায় পড়েছে?
— আমি তাকে কোনো সমস্যায় ফেলতে চাইনি।
— কিন্তু ফেলেছ।
রায়ান মাথা নিচু করল।
লোকটি বললেন,
— তোমার আর মেহরিনের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এটা মেনে নাও।
তিনি চলে গেলেন।
রায়ান অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তার সামনে একটা দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।
কিন্তু সে তখনো জানত না—
কিছু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেলেও ভেতর থেকে কেউ না কেউ অপেক্ষা করতে থাকে।
আর মেহরিনও অপেক্ষা করছিল।
একটা সুযোগের জন্য।
একটা দেখা করার জন্য।
একটা অসমাপ্ত কথার জন্য।
আর সেই কথাটাই হয়তো তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হয়ে উঠবে।
