পরদিন সকাল থেকেই রায়ানের মনটা অস্থির ছিল।
কেন অস্থির, সে নিজেও জানত না। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম যে কথাটা মনে পড়েছিল, সেটা ছিল মেহরিনের শেষ কথাটা
“আপনি থাকলে আসব।”
একটা সাধারণ কথা।
অথচ রায়ানের কাছে কথাটা যেন সারাদিনের অপেক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে তানভীরকে দেখেই সে জিজ্ঞেস করল,
লাইব্রেরিতে যাবি?
তানভীর অবাক হয়ে তাকাল।
— ক্লাসের আগে লাইব্রেরিতে যাওয়ার এত আগ্রহ কবে থেকে হলো?
— এমনিই।
— বুঝেছি।
— কী বুঝেছিস?
— কিছু না।
তানভীর ইচ্ছে করেই ‘কিছু না’ কথাটার ওপর জোর দিল।
রায়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
— তুই একদিন আমার এই কথাটার জন্য মার খাবি।
দুজনেই হেসে ফেলল।
ক্লাস শেষ হতে না হতেই রায়ান লাইব্রেরির দিকে চলে গেল।
কিন্তু মেহরিন তখনও আসেনি।
সে একটা বই নিয়ে জানালার পাশে বসে পড়ার চেষ্টা করল। পাঁচ মিনিট পর ঘড়ির দিকে তাকাল।
আরও দশ মিনিট।
আবার ঘড়ি।
নিজের ওপরই বিরক্ত লাগছিল তার।
সে মনে মনে বলল, “আমি এখানে ওর জন্য বসে আছি নাকি?”
ঠিক তখনই দরজা খুলল।
রায়ান মাথা তুলল।
মেহরিন দাঁড়িয়ে আছে।
আজ তার পরনে হালকা হলুদ পোশাক। হাতে সেই সাদা ছাতা। চুলগুলো খোলা, মুখে ছোট্ট একটা হাসি।
রায়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলল,
— এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলেন?
রায়ান বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— না তো।
মেহরিন তার সামনে এসে দাঁড়াল।
— সত্যি?
— হুম।
— তাহলে ঘড়ির দিকে এতবার তাকাচ্ছিলেন কেন?
রায়ান কিছু বলল না।
মেহরিন হেসে পাশের চেয়ারে বসে পড়ল।
— ঠিক আছে। বিশ্বাস করলাম।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
তারপর মেহরিন টেবিলের ওপর একটা ছোট্ট কাগজ রাখল।
রায়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— এটা কী?
— আপনার জন্য।
রায়ান কাগজটা খুলল।
সেখানে লেখা—
“গতকাল ছাতাটা ঠিক করে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আর বৃষ্টির মধ্যে এত দূর হাঁটার জন্যও।”
রায়ান কাগজটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— এতটুকু ব্যাপারের জন্য চিঠি?
— চিঠি না। ধন্যবাদ।
— মুখে বললেই তো হতো।
— কিছু কথা লিখে বললে বেশি সুন্দর লাগে।
রায়ান কাগজটা ভাঁজ করে নিজের বইয়ের ভেতর রেখে দিল।
মেহরিন সেটা দেখে বলল,
— রেখে দিলেন?
— হ্যাঁ।
— কেন?
— ফেলে দেওয়ার মতো কিছু মনে হলো না।
মেহরিন কিছু বলল না।
তার মুখের হাসিটা একটু গভীর হলো।
সেদিন তাদের কথার কোনো শেষ ছিল না।
মেহরিন জানাল, সে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়ছে। ছোটবেলা থেকেই বই পড়তে ভালোবাসে। তার স্বপ্ন একদিন নিজের একটা ছোট্ট লাইব্রেরি করা।
রায়ান বলল, তার স্বপ্ন একদিন নিজের একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান করার।
মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল।
— সত্যি?
— হ্যাঁ।
— তাহলে আমাদের স্বপ্ন তো কাছাকাছি।
— হয়তো।
— হয়তো কেন?
রায়ান মৃদু হেসে বলল,
— সব স্বপ্ন তো পূরণ হয় না।
মেহরিন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— হয় না। তবে কিছু স্বপ্নের জন্য লড়াই করতে হয়।
রায়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মেয়েটার কথা বলার ধরনটা তার ভালো লাগত।
কথাগুলো খুব সাধারণ। কিন্তু প্রতিবারই মনে হতো, কথার ভেতরে আরও কিছু লুকিয়ে আছে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল।
লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার সময় মেহরিন ব্যাগ গুছিয়ে বলল,
— কাল একটা জায়গায় যাবেন?
— কোথায়?
— নদীর পাড়ে।
— কেন?
— সূর্যাস্ত দেখতে।
রায়ান একটু অবাক হলো।
— আপনি আমাকে নিয়ে যেতে চান?
মেহরিন হেসে বলল,
— আপনি চাইলে যেতে পারেন।
— আমি যাব।
— তাহলে কাল বিকেল পাঁচটায়?
— ঠিক আছে।
মেহরিন উঠে দাঁড়াল।
দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
— রায়ান?
— হুম?
— আজকে একটা কথা বলিনি।
— কী?
— গতকাল আপনাকে প্রথম দেখার পর মনে হয়েছিল, আপনি খুব চুপচাপ মানুষ।
রায়ান হাসল।
— এখন কী মনে হয়?
মেহরিন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— এখন মনে হয়, আপনি চুপচাপ নন। শুধু আপনার কথা শোনার মতো মানুষ খুব কম।
কথাটা বলে সে চলে গেল।
রায়ান দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে নিজের বইটা বন্ধ করল।
বইয়ের ভেতরে রাখা ছোট্ট কাগজটা বের করল।
“কিছু কথা লিখে বললে বেশি সুন্দর লাগে।”
রায়ান অজান্তেই হাসল।
তার মনে হলো, মেহরিন শুধু তার বইয়ের পাতায় নয়—
ধীরে ধীরে তার জীবনের পাতাতেও জায়গা করে নিচ্ছে।
